চাকরি হারানো দুর্বিষহ ২৮ দিন

Just another Dude.

স্ট্রাগল, টু বি কন্টিনিউড

গর্দভের ষোল ঘন্টা::

এপ্রিল- ২০১২, প্রথম চাকরির তিনমাসের মাথায় আমার বস বলেছিলো- "You have to improve a lot". অথচ আমি চেষ্টা বা সময় দেয়ায় কোন কমতি রাখিনি। সবার আগে সকাল সাতটায় অফিসে যেতাম। সারাদিন আন্ধা-মান্ধা গুতাইতে গুতাইতে কোন রকমে দশ লাইন কোড লিখতে পারলেও সেখানে চার-পাঁচটা ভুল খুঁজে পাইতো। অন্যদের পাঁচ মিনিটের কাজ, ছয়-সাত ঘন্টায়ও কুল কিনারা করতে না পারলেও অফিসে পড়ে থাকতাম। ডেইলি চৌদ্দ থেকে ষোল ঘন্টা অফিসের কাজ করলেও গর্দভের মতো, একই ভুল বারবার করতাম।

অফিসের দরজার চাবি::

মে, ২০১২ তে কোম্পানি কয়েক হাজার ডলার খরচ করে আমার ওয়ার্ক পারমিট (H1B ) এর জন্য এপ্লাই করায় আমি ভাবছিলাম- আমি ভালো না করলেও আমাকে নিশ্চয়ই ফায়ার করবে না। করলে আমার পিছনে এতো খরচ করতো না। ২০১২ এর জুলাই এর ১৬ তারিখ বিকাল ৪টা ১৫ মিনিটে আমার বস আমাকে এসে বলে- "Do you have moment?" আমি তার সাথে সাথে একটা মিটিং রুমে গেলাম। সেখানে যাওয়ার পর বস বললো- We aren't happy with your performance. Today will be your last day here. We will provide you plane fare to go back to your country. তারপর আমার কাছ থেকে অফিসের দরজার চাবি নিয়ে নিলো। খুবই ঠাণ্ডা মেজাজে আমাকে নিয়ে আমার ডেস্কে এনে বললো- "Take all your personal belongings. I will walk you to the door".

পরাজিত শেয়াল::

দশ মিনিটের মধ্যেই পুরা প্রসেস শেষ। কি করা উচিত, কি বলা উচিত, চিন্তা করার আগেই চাকরীচ্যুত হয়ে রাস্তায়। ৮৩ তলা AON Center নামক অফিস বিল্ডিংটার দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে পরাজিত শেয়ালের মতো মাথা নিচু করে চেনা রাস্তায় অচেনা-ভাবে হাঁটতে লাগলাম। হাটা ছাড়া আর কিছুই করার ছিলো না। কারণ আমার নীল আকাশ, বেদনার নীল রঙে মূর্ছা খেয়ে গেছে। কোটি মানুষের শহরে মুহূর্তেই একা হয়ে গেছি। ভারী হয়ে যাওয়া পাগুলো টানতে টানতে থামলাম ম্যাকডোনাল্ডস এ। ফ্রি ওয়াইফাই উইজ করে নেক্সট স্টেপগুলার একটা রাফ আউটলাইন বানিয়েই সেদিন বাসায় ফিরছিলাম। রাত সাড়ে দশটায় ঘুমাতে যাওয়ায় ছেলেটা ভোর পর্যন্ত জেগে কি কি করা লাগবে সেটার ডিটেইল ঠিক করলো। নিজের দুর্দশার কথা বাবা-মাকে জানিয়ে তাদের কষ্ট বাড়ানোর সাহস করতে পারিনি। মাথার ভিতরে সেকেন্ডে সেকেন্ড একটাই আওয়াজ বাজতে লাগলো- দুই মাসের মধ্যে জব জোগাড় করতে না পারলে দেশে ফেরত যেতে হবে। এটাই আমেরিকান সরকারের আইন।

জব হান্টিং মিশন::

ভেঙ্গে পড়লেও সরে যেতে চাইনি। দুঃখ পেলেও বিষণ্ণতায় সময় নষ্ট করিনি। সেই রাতেই রেজুমি (সিভি) আপডেট করেই পরেরদিন সকালে জব হান্টিং মিশনে নামলাম। পরিচিত কয়েকজনকে ইমেইল করেও রেসপন্স পাইনি। এক সপ্তাহ চলে গেলেও, কেউ ইন্টারভিউতে ডাকেনি। প্রেসার, টেনশন আর অনিশ্চয়তাকে যতটা সম্ভব সাইডে রেখে জান-প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করতে লাগলাম। পিএইচডি করার অপশন টিকলো না। জুলাই মাসে কোন ইউনিভার্সিটিতে এডমিশন দেয় না। শিকাগোর কনসালটেন্সি ফার্মগুলাও ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট হায়ার করতে চায় না। নিউ জার্সির ইন্ডিয়ান কনসালটেন্সি ফার্মগুলাতে খোঁজ লাগিয়ে তেমন সুবিধা পাচ্ছিলাম না। দুই সপ্তাহের চৌদ্দ দিন এইভাবে কেটে গেলে। শেষমেশ রেজুমি হালকা মডিফাই করে, ফায়ার করে দেয়া চাকরিটা এখনো করতেছি লিখার পরে দুই-একটা ইন্টারভিউ পেলাম। কিন্তু জব হচ্ছিলো না।

rock star ::

তবে যাকে যতবার নক করা যায়, তাকে ততবারের চাইতে দ্বিগুণ নক করেছি। অন্যরা ইগনোর করলে, বিরক্ত হলেও আমি হাল ছাড়িনি। দুই সপ্তাহ পরে MPS Partners নামে শিকাগোর একটা কনসালটেন্সি ফার্মের Corey নামের একজন আগ্রহ দেখালেও তাদের হায়ারিং ম্যানেজার অন্য শহরে থাকায় টাইম সেট করতে পারছিলো না এবং পিছাচ্ছিলো। এইভাবে প্যাঁচাপ্যাঁচি করতে করতে আরো এক সপ্তাহ নষ্ট করলো। কিন্তু আমার তো দুই মাস লিমিট। তাই অল্টারনেটিভ হিসেবে ফোন বা স্কাইপে ইন্টারভিউ নিতে তাগাদা দিছিলাম কয়েকবার। সে বিরক্ত হয়ে বলছিলো- "Unless you are a rock star, we cannot hire you over the phone." প্রত্যুত্তরে আমি বলেছিলাম-"I am not a rock star but you will see a rock star soon". শেষমেশ ওরা ফোনেই ইন্টারভিউ নিছিলো। এবং জব অফার করে।

দুর্বিষহ ২৮ দিন

লাস্টের দিকে টানা কয়েকটা ইন্টারভিউ পেয়ে যাই। MPS Partners এর জব পাওয়ার পরেরদিনই Nielsen এর ইন্টারভিউ ছিলো। তারপরের দিন আবার Crate and Barrel এ ইন্টারভিউ ছিলো। Crate and Barrel এ ইন্টারভিউ দেয়া শেষ করে পার্কিং লটে বসে গাড়ি স্টার্ট দেয়ার সময় Nielsen থেকে ফোন করে জব কনফার্ম করে। এরপর আগস্ট ১৩, ২০১২ তে নিলসেনে জয়েন করে আমার লাইফের দুর্বিষহ ২৮ দিনের অবসান হয়।

স্ট্রাগল টু বি কন্টিনিউড - ১০


FB post